ঢাকা ০১:৩১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

ডিমে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাচ্ছে!

খায়রুন নাহার


দেশীয় খামারে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ সাড়ে ১০ টাকার বেশি। বড় খামারিরা খামার গেইটে ১০ টাকা ৫৭ পয়সা এবং নিজস্ব বিক্রয় কেন্দ্রে ১১টাকা ০১ পায়সায় বিক্রি করছেন। এতে করে উৎপাদক পর্যায়ে অনধিক মুনাফা বেধে দিয়েছে সরকার সংশ্লিষ্টরা। অথচ সেই ডিম তিন হাত বদলে খুচরা বাজারে বিক্রি হয়েছে ১৫ টাকা।
অপর দিকে সাড়ে ৭টাকা আমদানি খরচের ডিমও ভোক্তা কিনছে একই দরে। এ পরিস্থিতি বিশ্লেষনে বাজার বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে ডিমে লাভের গুড় বিষ পিঁপড়ায় খাচ্ছে?
অর্থাৎ পাইকারি ব্যবসায়ী থেকে খুচরা ব্যবসায়ী পর্যায়ে ডিম প্রতি ৪ টাকা মুনাফা? এমনতর বাজার পরিস্থিতিতে বিশেষ মহলের প্ররোচনায় নাম সর্বস্ব একটি সংগঠনের ব্যনারে “সিন্ডিকেট” করে ডিমের দাম বাড়ানোর প্রচার করা হয়েছে জোড়েসোড়ে।
প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামত উপেক্ষা করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রনাধিন বিাজার নিয়ন্ত্রক দুটি সংস্থার উদ্যোগী ভূমিকায় “সিন্ডিকেট” ভেঙ্গে দাম কমাতে ডিম আমদানির অনুমোতি দেওয়া হয়। এর পর বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিন দফায় ভারত থেকে ডিম আমদানি করা হয়েছে। আমদানি করা প্রতিটি ডিমের মোট খরচ সাড়ে সাত টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
আমদানি করা ডিমও বাজারজাত করা হয়েছে। ক্রেতারা আগের দামেই ডিম কিনেছেন। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে”ডিম আমদানি করা হয়েছে কার স্বার্থে? আমদানি করা ডিমও কেন চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে? এখনো কেন ভোক্তা স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে? এখন কি বলবে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর কিংবা প্রতিযোগিতা কমিশন?
স্থানীয় পর্য়ায়ে ডিম উৎপাদন ব্যয় বেশির মূল কারণ মুরগির বাচ্চা, খাবার ও ওষুধের দাম। এই তথ্য জানিয়ে পোলট্রি শিল্প মালিকদের সংগঠনের প্রশ্ন, এ বিষয়ে উদ্যোগ না নিয়ে আমদানি কেন? আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদে হিতে বিপরীত হয়ে খামার বন্ধ হয়ে যাবে- এমন শঙ্কার কথাও বলছে তারা।
বিশেষ মহলের স্বার্থ সংরক্ষণে যে অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে পরিকল্পিত “ডিম সিন্ডিকেট”-এর প্রচার চালানো হয়েছে নতুন করে তারাই আবার বলছে, “ডিম আমদানি করার মানে হল ক্ষুদ্র খামার যা আছে, তাও বন্ধ করে দেওয়া। সরকার এটা করছে আমদানিকারক কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দেওয়ার জন্য।”
জানা যায়, ডিমের তিনটি চালানের মধ্যে দুটি এনছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ঢাকার ‘হাইড্রো ল্যান্ড সল্যুশন’। প্রতিষ্ঠানটি ডিমের যে আমদানি মূল্যের দেখিয়েছে, তাতে কর পরিশোধের পরেও দাম পড়েছে সাড়ে সাত টাকা।
এ পযর্ন্ত তিন চালানে আনা প্রায় ৭ লাখ ডিম বাজার দারে ইতিবাচক কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি, বরং উল্টো দাম বেড়েছে। এর পরও সরকার আরও চার কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দিয়েছে। যদিও দেশের বাজারে প্রতি দিন ডিমের চাহিদা ৫লাখ পিস। ডিম আমদানির সুফল সাধারণ ভোক্তারা পাচ্ছেন না-ঢাকার দুটি পাইকারি আড়তের বিক্রেতারাও বলছেন সে কথা।
সামনে শীতকাল আসছে, ডিমের দাম এই সময়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কমে জানিয়ে পোলট্রি মালিকদের সংগঠন থেকে খামারিদের ন্যায্য মূল্যে মুরগির বাচ্চা ও খাবারের দাম নিশ্চিতে মনযোগ দিত সরকারী সংস্থাগুলোর প্রতি আহবান জানানো হয়েছে।
তেজগাঁওয়ের পাইকারিতে বিক্রেতা আরিফুল ইসলাম বলেন, “ডিমের দাম বাড়ার কারণ হইল বিভিন্ন জেলায় বন্যা হওয়ায় ডিমের সংকট তৈরি হয়েছে।” খামারিরা বলছেন, খাবার ও বাচ্চার দাম বেশি হওয়ায় দেশে ডিম উৎপাদনের খরচ বেশি। এটিই ডিমের দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
ফার্মগেটে ডিমের আড়ত মা-বাবার দোয়ার বিক্রেতা মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, “ভারতের ডিম আমদানিতে দেশের বাজারে কোনো প্রভাব পড়ে না। তাহলে কী কারণে ভারতের ডিম আমদানি করা হয় সেটাও ভেবে পাই না।
“যারা আমদানি করে শুধু তাদের লাভটা হচ্ছে। এছাড়া আর কারও লাভ হচ্ছে না। দেশের যে খুব উপকার হয়ে যাচ্ছে বিষয়টি তাও না। ভারতের ডিম আকারে ছোট, আর নষ্ট থাকে সেখান থেকে প্রক্রিয়া মেনে দেশে আসতে আসতে তো টাইম লাগে।” তবে এখন পর্যন্ত আমদানিকারক ছাড়া ভোক্তারা কোনো লাভবান হয়নি।
খামারিদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে “আমদানি করে এখন দেশের বাজারে প্রভাব পড়ছে না, তবে লাভ হচ্ছে করপোরেট কোম্পানি আর আমদানিকারকদের।
তবে আমদানিকারক কোম্পানি হাইড্রো ল্যান্ড সলিউশনের কর্মকর্তা মিল্টন রায় বলেন, “খালি দাম আর ট্যাক্সের হিসাব করলে তো হবে না। এর সঙ্গে গুদাম ভাড়া, এলসি খরচ, ট্রাক ভাড়া যোগ হবে। সব মিলিয়ে প্রতিটি ডিমের খরচ সাড়ে ৮ টাকা। এক চালানেআমদানি করা ২ লাখ ডিমে নষ্ট হয় ১৬ থেকে ১৭ হাজার। আরো খরচ যায় ১ টাকা। সব মিলিয়ে সাড়ে ১০ টাকার মত খরচ হয়ে যায়।”
আমদানিকারকের এমনতর তথ্যের ভিত্তিতে পোলট্রি পণ্য বিপনন বিশ্লেষক অঞ্জন মজুমদার প্রশ্ন তুলেছেন, “সাড়ে সাত টাকা আমদানি খরচের ডিম যদি ১৪ টাকায় দেশের বাজারে বিক্রি করা হয় তাহলে লাভটা কার? আর দেশে সাড়ে ১০ টাকা উৎপাদন খরচের ডিম বাজারে পৌঁছে ১৫ টাকা কেন হবে? পাইকার, আড়ৎদার আর খুচরা পর্যায়ে অতি মনাফা ঠেকাতে পারলেই ডিমের দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে।”

নিউজটি শেয়ার করুন
ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

ডিমে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাচ্ছে!

আপডেট সময় ১১:০৯:২১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ অক্টোবর ২০২৪


দেশীয় খামারে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ সাড়ে ১০ টাকার বেশি। বড় খামারিরা খামার গেইটে ১০ টাকা ৫৭ পয়সা এবং নিজস্ব বিক্রয় কেন্দ্রে ১১টাকা ০১ পায়সায় বিক্রি করছেন। এতে করে উৎপাদক পর্যায়ে অনধিক মুনাফা বেধে দিয়েছে সরকার সংশ্লিষ্টরা। অথচ সেই ডিম তিন হাত বদলে খুচরা বাজারে বিক্রি হয়েছে ১৫ টাকা।
অপর দিকে সাড়ে ৭টাকা আমদানি খরচের ডিমও ভোক্তা কিনছে একই দরে। এ পরিস্থিতি বিশ্লেষনে বাজার বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে ডিমে লাভের গুড় বিষ পিঁপড়ায় খাচ্ছে?
অর্থাৎ পাইকারি ব্যবসায়ী থেকে খুচরা ব্যবসায়ী পর্যায়ে ডিম প্রতি ৪ টাকা মুনাফা? এমনতর বাজার পরিস্থিতিতে বিশেষ মহলের প্ররোচনায় নাম সর্বস্ব একটি সংগঠনের ব্যনারে “সিন্ডিকেট” করে ডিমের দাম বাড়ানোর প্রচার করা হয়েছে জোড়েসোড়ে।
প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামত উপেক্ষা করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রনাধিন বিাজার নিয়ন্ত্রক দুটি সংস্থার উদ্যোগী ভূমিকায় “সিন্ডিকেট” ভেঙ্গে দাম কমাতে ডিম আমদানির অনুমোতি দেওয়া হয়। এর পর বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিন দফায় ভারত থেকে ডিম আমদানি করা হয়েছে। আমদানি করা প্রতিটি ডিমের মোট খরচ সাড়ে সাত টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
আমদানি করা ডিমও বাজারজাত করা হয়েছে। ক্রেতারা আগের দামেই ডিম কিনেছেন। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে”ডিম আমদানি করা হয়েছে কার স্বার্থে? আমদানি করা ডিমও কেন চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে? এখনো কেন ভোক্তা স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে? এখন কি বলবে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর কিংবা প্রতিযোগিতা কমিশন?
স্থানীয় পর্য়ায়ে ডিম উৎপাদন ব্যয় বেশির মূল কারণ মুরগির বাচ্চা, খাবার ও ওষুধের দাম। এই তথ্য জানিয়ে পোলট্রি শিল্প মালিকদের সংগঠনের প্রশ্ন, এ বিষয়ে উদ্যোগ না নিয়ে আমদানি কেন? আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদে হিতে বিপরীত হয়ে খামার বন্ধ হয়ে যাবে- এমন শঙ্কার কথাও বলছে তারা।
বিশেষ মহলের স্বার্থ সংরক্ষণে যে অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে পরিকল্পিত “ডিম সিন্ডিকেট”-এর প্রচার চালানো হয়েছে নতুন করে তারাই আবার বলছে, “ডিম আমদানি করার মানে হল ক্ষুদ্র খামার যা আছে, তাও বন্ধ করে দেওয়া। সরকার এটা করছে আমদানিকারক কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দেওয়ার জন্য।”
জানা যায়, ডিমের তিনটি চালানের মধ্যে দুটি এনছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ঢাকার ‘হাইড্রো ল্যান্ড সল্যুশন’। প্রতিষ্ঠানটি ডিমের যে আমদানি মূল্যের দেখিয়েছে, তাতে কর পরিশোধের পরেও দাম পড়েছে সাড়ে সাত টাকা।
এ পযর্ন্ত তিন চালানে আনা প্রায় ৭ লাখ ডিম বাজার দারে ইতিবাচক কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি, বরং উল্টো দাম বেড়েছে। এর পরও সরকার আরও চার কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দিয়েছে। যদিও দেশের বাজারে প্রতি দিন ডিমের চাহিদা ৫লাখ পিস। ডিম আমদানির সুফল সাধারণ ভোক্তারা পাচ্ছেন না-ঢাকার দুটি পাইকারি আড়তের বিক্রেতারাও বলছেন সে কথা।
সামনে শীতকাল আসছে, ডিমের দাম এই সময়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কমে জানিয়ে পোলট্রি মালিকদের সংগঠন থেকে খামারিদের ন্যায্য মূল্যে মুরগির বাচ্চা ও খাবারের দাম নিশ্চিতে মনযোগ দিত সরকারী সংস্থাগুলোর প্রতি আহবান জানানো হয়েছে।
তেজগাঁওয়ের পাইকারিতে বিক্রেতা আরিফুল ইসলাম বলেন, “ডিমের দাম বাড়ার কারণ হইল বিভিন্ন জেলায় বন্যা হওয়ায় ডিমের সংকট তৈরি হয়েছে।” খামারিরা বলছেন, খাবার ও বাচ্চার দাম বেশি হওয়ায় দেশে ডিম উৎপাদনের খরচ বেশি। এটিই ডিমের দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
ফার্মগেটে ডিমের আড়ত মা-বাবার দোয়ার বিক্রেতা মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, “ভারতের ডিম আমদানিতে দেশের বাজারে কোনো প্রভাব পড়ে না। তাহলে কী কারণে ভারতের ডিম আমদানি করা হয় সেটাও ভেবে পাই না।
“যারা আমদানি করে শুধু তাদের লাভটা হচ্ছে। এছাড়া আর কারও লাভ হচ্ছে না। দেশের যে খুব উপকার হয়ে যাচ্ছে বিষয়টি তাও না। ভারতের ডিম আকারে ছোট, আর নষ্ট থাকে সেখান থেকে প্রক্রিয়া মেনে দেশে আসতে আসতে তো টাইম লাগে।” তবে এখন পর্যন্ত আমদানিকারক ছাড়া ভোক্তারা কোনো লাভবান হয়নি।
খামারিদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে “আমদানি করে এখন দেশের বাজারে প্রভাব পড়ছে না, তবে লাভ হচ্ছে করপোরেট কোম্পানি আর আমদানিকারকদের।
তবে আমদানিকারক কোম্পানি হাইড্রো ল্যান্ড সলিউশনের কর্মকর্তা মিল্টন রায় বলেন, “খালি দাম আর ট্যাক্সের হিসাব করলে তো হবে না। এর সঙ্গে গুদাম ভাড়া, এলসি খরচ, ট্রাক ভাড়া যোগ হবে। সব মিলিয়ে প্রতিটি ডিমের খরচ সাড়ে ৮ টাকা। এক চালানেআমদানি করা ২ লাখ ডিমে নষ্ট হয় ১৬ থেকে ১৭ হাজার। আরো খরচ যায় ১ টাকা। সব মিলিয়ে সাড়ে ১০ টাকার মত খরচ হয়ে যায়।”
আমদানিকারকের এমনতর তথ্যের ভিত্তিতে পোলট্রি পণ্য বিপনন বিশ্লেষক অঞ্জন মজুমদার প্রশ্ন তুলেছেন, “সাড়ে সাত টাকা আমদানি খরচের ডিম যদি ১৪ টাকায় দেশের বাজারে বিক্রি করা হয় তাহলে লাভটা কার? আর দেশে সাড়ে ১০ টাকা উৎপাদন খরচের ডিম বাজারে পৌঁছে ১৫ টাকা কেন হবে? পাইকার, আড়ৎদার আর খুচরা পর্যায়ে অতি মনাফা ঠেকাতে পারলেই ডিমের দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে।”

নিউজটি শেয়ার করুন