ঢাকা ০২:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

রাজস্ব আদায়ে শনির দশা কাটাতে বহুমুখী পরিকল্পনা এনবিআরের

খায়রুন নাহার



রাজস্ব আদায়ে শনির দশা কাটছে না। বরং উল্টো ক্রমেই ঘটতি বেড়ে চলেছে। অর্থবছরের শুরুর পর জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের কোনো মাসেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি জাতয়ি রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতার পাশাপাশি যোগ হয়েছে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি।


এরই মধ্যে নানামুখী চাপ সামলাতে অন্তর্বতী সরকার বিভিন্ন পর্য়ায়ে শুল্ক,ও কর ও কমিয়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সামনের রাজস্ব আয়ের হিসেবে। এতে উদ্বিঘ্ন কর্মকর্তারা বকেয়া আয়কর, মূল্য সংযোজন কর ও আমদানি শুল্ক আদায়ে বহুমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৎপরতা বাড়ানোর পাশপাশি কঠোর হওয়ার মনোভাব পোষন করেছেন।


সেই সাথে কর অব্যাহতি ব্যাপক হারে কমানোর পরিকল্পনার কথাও জানা গেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশি বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে বছরে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকা দেওয়া হোত। যা ব্যাপক মাত্রায় কমিয়ে আনার পথে এগুচ্ছে এনবিআর।


এনবিআর এর সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, চলতি ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রথম চার মাস জুলাই-সেপ্টেম্বরে সার্বিকভাবে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৩০ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা।
গত জুলাই খেকে অক্টোবর পর্যন্ত মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩২ হাজার ১১৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। যার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ২৮১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এ সময়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৩০ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ০৩ শতাংশ।


এরই মাঝে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। আগারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বর্ধিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে পরিকল্পনা জমা দিতে বলেছে।


এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, এই পরিকল্পনা চলতি মাসের মধ্যেই পেতে চায় আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। এ পরিকল্পনা আইএমএফের ওয়াশিংটনের পর্ষদে উপস্থাপন করা হবে।


আর এ জন্য সম্প্রতি এনবিআর তার আয়কর, ভ্যাট এবং কাস্টমস উইংয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। ওই বৈঠকে লাগসই পরিকল্পনা প্রণয়েনের হরেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন সংশ্লিস্ট কর্কর্তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান,নতুন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে হলে আগের তুলনায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় করতে হবে। কীভাবে এ অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করা হবে, তার পরিকল্পনা দিতে বলেছে আইএমএফ। ক্ষমতার পটপরিবর্তনে একাধিক খাতে আয়কর ছাড় দিয়েছে এনবিআর।
সূত্র জানায়, আয়কর শাখা থেকে নতুন করে চলতি অর্থবছরে কোনো কর রেয়াত বাদ দেওয়া বা করহার বাড়ানো কঠিন। কেননা বছরের মাঝামাঝি এসব পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়। আবার আমদানি পর্যায়ে শুল্ক বাড়ালে তার প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে সরাসরি পড়তে পারে।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, গত নভেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশ। এটি গত সাড়ে ১৩ বছরের মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হার। এসব বিষয় বিবেচনা করে কর ও শুল্ক খাতে সুবিধা কমানোর চিন্তা বাদ দিয়ে কীভাবে রাজস্ব আদায় বাড়ানো যায় তার চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।


এক কর্মকর্তা জানান, কোন খাতের কর রেয়াত কমানো সম্ভব তা নিয়ে কাজ চলছে। তবে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। আলাপ-আলোচনা চলছে। বিষয়টি চূড়ান্ত করে আইএমএফকে জানানো হবে।


এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে তিন লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা (আইবাস-এর হিসাব অনুযায়ী), যা জিডিপির ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। আইএমএফ এর লক্ষ্য অনুযায়ী চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের হার জিডিপির ০ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানোর কথা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাজস্ব আদায় কমতির দিকে। এতে এনবিআর বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন
ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

রাজস্ব আদায়ে শনির দশা কাটাতে বহুমুখী পরিকল্পনা এনবিআরের

আপডেট সময় ১০:৩৯:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৪



রাজস্ব আদায়ে শনির দশা কাটছে না। বরং উল্টো ক্রমেই ঘটতি বেড়ে চলেছে। অর্থবছরের শুরুর পর জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের কোনো মাসেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি জাতয়ি রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতার পাশাপাশি যোগ হয়েছে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি।


এরই মধ্যে নানামুখী চাপ সামলাতে অন্তর্বতী সরকার বিভিন্ন পর্য়ায়ে শুল্ক,ও কর ও কমিয়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সামনের রাজস্ব আয়ের হিসেবে। এতে উদ্বিঘ্ন কর্মকর্তারা বকেয়া আয়কর, মূল্য সংযোজন কর ও আমদানি শুল্ক আদায়ে বহুমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৎপরতা বাড়ানোর পাশপাশি কঠোর হওয়ার মনোভাব পোষন করেছেন।


সেই সাথে কর অব্যাহতি ব্যাপক হারে কমানোর পরিকল্পনার কথাও জানা গেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশি বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে বছরে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকা দেওয়া হোত। যা ব্যাপক মাত্রায় কমিয়ে আনার পথে এগুচ্ছে এনবিআর।


এনবিআর এর সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, চলতি ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রথম চার মাস জুলাই-সেপ্টেম্বরে সার্বিকভাবে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৩০ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা।
গত জুলাই খেকে অক্টোবর পর্যন্ত মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩২ হাজার ১১৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। যার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ২৮১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এ সময়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৩০ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ০৩ শতাংশ।


এরই মাঝে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। আগারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বর্ধিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে পরিকল্পনা জমা দিতে বলেছে।


এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, এই পরিকল্পনা চলতি মাসের মধ্যেই পেতে চায় আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। এ পরিকল্পনা আইএমএফের ওয়াশিংটনের পর্ষদে উপস্থাপন করা হবে।


আর এ জন্য সম্প্রতি এনবিআর তার আয়কর, ভ্যাট এবং কাস্টমস উইংয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। ওই বৈঠকে লাগসই পরিকল্পনা প্রণয়েনের হরেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন সংশ্লিস্ট কর্কর্তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান,নতুন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে হলে আগের তুলনায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় করতে হবে। কীভাবে এ অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করা হবে, তার পরিকল্পনা দিতে বলেছে আইএমএফ। ক্ষমতার পটপরিবর্তনে একাধিক খাতে আয়কর ছাড় দিয়েছে এনবিআর।
সূত্র জানায়, আয়কর শাখা থেকে নতুন করে চলতি অর্থবছরে কোনো কর রেয়াত বাদ দেওয়া বা করহার বাড়ানো কঠিন। কেননা বছরের মাঝামাঝি এসব পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়। আবার আমদানি পর্যায়ে শুল্ক বাড়ালে তার প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে সরাসরি পড়তে পারে।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, গত নভেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশ। এটি গত সাড়ে ১৩ বছরের মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হার। এসব বিষয় বিবেচনা করে কর ও শুল্ক খাতে সুবিধা কমানোর চিন্তা বাদ দিয়ে কীভাবে রাজস্ব আদায় বাড়ানো যায় তার চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।


এক কর্মকর্তা জানান, কোন খাতের কর রেয়াত কমানো সম্ভব তা নিয়ে কাজ চলছে। তবে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। আলাপ-আলোচনা চলছে। বিষয়টি চূড়ান্ত করে আইএমএফকে জানানো হবে।


এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে তিন লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা (আইবাস-এর হিসাব অনুযায়ী), যা জিডিপির ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। আইএমএফ এর লক্ষ্য অনুযায়ী চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের হার জিডিপির ০ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানোর কথা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাজস্ব আদায় কমতির দিকে। এতে এনবিআর বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন