‘স্বৈরাচারের রাজনীতি সৃষ্টি করেছে অনাচারের অর্থনীতি’
‘দেশে স্বেচ্ছাচারী রাজনীতি জন্ম দিয়েছে অনাচার অর্থনীতির। অবশ্য তিনি বলেন, এ দুটি পরস্পরের পরিপূরক। তবে প্রশ্ন করা যায়, স্বৈরাচারী বা স্বেচ্ছাচারী রাজনীতি অনাচার অর্থনীতিকে জন্ম দিয়েছে, নাকি উল্টোটা ঘটেছে। অর্থাৎ অনাচার অর্থনীতি স্বেচ্ছাচারী রাজনীতি তৈরি করেছে।’ এ কথা বলেছেন অন্তবর্তী সরকার গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
দেশের অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) এর সাথে সম্প্রতি এক মতবিনিময় সভায় গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি দেখছে, বিগত সরকারের সময় চারটি খাতে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে। যেমন ব্যাংক, জ্বালানি, সরকারি প্রকল্প এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাত। অন্যান্য খাতেও দুর্নীতি হয়েছে, তবে এই চার খাতের সঙ্গে তুলনীয় নয়।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের একটি সরকারী মিলনায়তনে আয়োজিত ওই মতবিনিময় সভায় বরেণ্য অর্থনীতিবিদ ডক্টর দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, দেশের ভেতরে সাম্প্রতিককালে একটি অনাচার অর্থনীতির সৃষ্ট হয়েছিল। এই অনাচার অর্থনীতির পেছনে একটি কলুষ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
সেই কলুষ সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে উর্দি পরা ও উর্দি ছাড়া আমলারা যেমন ছিলেন, এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন রাজনীতিবিদেরা এবং একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এঁরা সবাই মিলে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কুক্ষিগত করে ফেলেছিলেন।
সে সময় উন্নয়নের একটি বয়ানও সৃষ্টি করা হয়েছিল, সেই অনাচার অর্থনীতির ঘাটতিকে পূরণ করার জন্য। আর সেই উন্নয়নের বয়ানকে রক্ষা করার জন্য স্বৈরাচারী রাজনীতির প্রয়োজন পড়েছিল।
তিনি বলেন, শেষ বিচারের রাজনীতি ঠিক না হলে স্বচ্ছতা, দক্ষতা, জবাবদিহিতা, সুষম উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, তার ওপরই আগামী দিনের রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নির্ভর করবে। এই সংস্কারগুলোর পরিধি, ধারাবাহিকতা ও গতি কী হবে তা নির্ভর করবে চলমান অর্থনীতিতে সরকার কতখানি আশ্বস্ত থাকবে, জনগণ কতখানি স্বস্তি পাবে, তার ওপর।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এই মুহূর্তে বিভিন্ন ধরনের চলমান পদক্ষেপ চলছে। সরকারের দিক থেকে বিভিন্ন ধরনের ইতিবাচক সংস্কার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা ও উদ্যোগ লক্ষ করছি। একই সঙ্গে আমরা লক্ষ করছি বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক বিধিনিষেধ। মনে রাখতে হবে, ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের ওপরে যখন আমরা কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করি, তখন তার অর্থনৈতিক তাৎপর্য আছে।
এর মানে হলো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের রাজনৈতিক ভূমিকার পাশাপাশি আমরা তাদের অর্থনৈতিক ভূমিকাকেও সংকুচিত করার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছি। এটা যে হবেই তা বলছি না। তবে এ বিষয়গুলোকে আগামী দিনে মনে রাখতে হবে সংস্কার পদক্ষেপগুলো টেকসই করার জন্য।’
মতবিনিময় সভার শুরুতেই দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘পুরোনো ভ্রান্তি থেকে আগামী দিনের পথ খুঁজতে চাচ্ছি। এ বিষয়ে কমিটি ৯০ দিনের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দেবে। তবে এখানে কোনো ব্যক্তি নিয়ে নয়, বরং প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি ৫টি জায়গায় মূলত কাজ করছে। যেমন অর্থনৈতিক অনাচার মেরামত করতে কোন কোন খাতে সংস্কার প্রয়োজন, তা বলা হবে। চারটি খাতে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। কাজের দ্বিতীয় ক্ষেত্র হচ্ছে এ রকম এক পরিস্থিতিতে মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা কী হবে, তা বিশ্লেষণ করা। কেননা অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, শ্বেতপত্র কমিটি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী কী করণীয়, তারও একটি রূপরেখার কথা বলবে। এরপরের বিষয় হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ঘাটতিগুলো কীভাবে পূরণ করা যায়। এখানে তথ্য-উপাত্তের বিশ্বাসযোগ্যতা একটি বড় বিষয়। এই তথ্য-উপাত্ত নিয়েও সন্দেহ–সংশয় আছে অনেক দিন ধরে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা নিজেদের অসহায়ত্ব ও সরকারের হস্তক্ষেপের কথা বলেছেন।
অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক এ কে এনামুল হক, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এবং কমিটিকে সহায়তা প্রদানকারী সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষক তৌফিকুল ইসলাম।
ইআরএফ থেকে আলোচনায় অংশ নেন সভাপতি মোহাম্মদ রেফায়েত উল্লাহ মৃধা ও সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমসহ সাবেক সভাপতি সুলতান মাহমুদ, খাজা মাঈন উদ্দিন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক শওকত হোসেন মাসুম, জিয়াউর রহমান, সিনিয়র সদস্য মুনিমা সুলতানা, দৌলত আক্তার মালা, সুশান্ত কুমার সিনহা প্রমুখ।














