অটোমেশন ও ডিজিটাল ব্যাংকিং এগিয়ে নেওয়া আমাদের লক্ষ্য: মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ
শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ২০০১ সালের ১০ মে কার্যক্রম শুরু করে। ২৫ বছর পূর্ণ করে আজ ২৬ বছরে পা রাখছে ব্যাংকটি। ২৫ বছর পূর্তি এবং ব্যাংক খাতের বিভিন্ন বিষয়ে এক জাতীয় দৈনিকে কথা বলেছেন ব্যাংকটির এমডি মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওবায়দুল্লাহ রনি
২৫ বছর পার করেছে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির বর্তমান অবস্থা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মোসলেহ্ উদ্দীন: ২৫ বছরে যে কোনো ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন করেছে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক। একই সঙ্গে গ্রাহকদের আস্থা এবং বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছে। ব্যাংকটির আমানত বেড়ে ৩২ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। বিনিয়োগ রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। গত বছর ৪২ হাজার কোটি টাকা রপ্তানি, ৪৪ হাজার কোটি টাকা আমদানি এবং ৫০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স আহরণ আমাদের ব্যাংকের মাধ্যমে হয়েছে। পুরো ব্যাংক খাতের মধ্যে বৈদেশিক বাণিজ্যে আমাদের অবস্থান দ্বিতীয়। গত বছর আমাদের এক হাজার ৪৫০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা হয়েছে। ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত রয়েছে ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ। আমাদের কোনো তারল্য সংকট নেই। বিনিয়োগ-আমানত অনুপাত এখন ৮২ শতাংশ, যেখানে ৯২ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। আমরা গত ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিয়মিতভাবে লভ্যাংশ দিয়ে আসছি। বর্তমানে আমাদের মূলধন রয়েছে প্রায় চার হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
ব্যাংক খাতের অন্যতম একটি সমস্যা খেলাপি ঋণ। এ ক্ষেত্রে আপনাদের অবস্থা কেমন?
মোসলেহ্ উদ্দীন: অডিটের পর আমাদের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। আমাদের অন্যতম গর্বের বিষয় হলো শক্তিশালী ক্রেডিট রেটিং। টেকসই অর্থায়নে শীর্ষ ১০টি ব্যাংকের মধ্যে আমরা আছি। শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে আইসিএবি, সাফা, আইসিএমএবি এবং আইসিএসবি থেকে স্বর্ণপদক পেয়ে আসছে। এসব অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক আর্থিক ভিত্তির কারণে। বর্তমানে সারাদেশে ১৪২টি শাখা ও ১৫০টি উপশাখা রয়েছে। এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট, এটিএম বুথসহ সব ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের পুরো ব্যাংকিং ডিজিটাল পদ্ধতিতে হচ্ছে। ‘শাহ্জালাল টাচ’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রাথমিক সব কাজই করা যায়।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আপনারা কোন খাতে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন?
মোসলেহ্ উদ্দীন: শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের ২৭ শতাংশ এখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে। বাংলাদেশ ব্যাংক মোট ঋণের ২৫ শতাংশ এ খাতে বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে। ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে সিএমএসএমইতে ১২টি নতুন পণ্য আনা হবে। আগামীতে আমাদের লক্ষ্য অটোমেশন এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া। আমাদের মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যাংকটিকে আরও এগিয়ে নিতে কোন বিষয়গুলোকে আপনারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন?
মোসলেহ্ উদ্দীন: আমরা পাঁচটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে সামনে এগোতে চাই। ডিজিটাল ব্যাংকিং ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি প্রথম অগ্রাধিকার। এ ছাড়া মানসম্মত আধুনিক সেবা, প্রচলিত সব কিছু অটোমেশনে রূপান্তর, মানবসম্পদের উন্নয়ন এবং রিটেইল ও এসএমই ব্যাংকিংকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হবে। আমাদের প্রধান কার্যালয় ব্যাংকিং খাতের প্রথম ‘লিড সার্টিফায়েড গ্রিন বিল্ডিং’। এই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। শাহ্জালাল ইসলামী কোনো ব্যক্তির ব্যাংক নয়, জনগণের ব্যাংক। পরিচালকদের মধ্যে সবাই পর্যায়ক্রমে চেয়ারম্যান হন। সবার মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে পর্ষদ পরিচালিত হয়। আমাদের ২৮শ কর্মী আছে। কর্মীদের মধ্যে ব্যাংক ছেড়ে যাওয়ার হার খুবই কম। এটি প্রমাণ করে যে, কর্মীরা এখানে ভালো আছেন।
বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতার জন্য কি করা দরকার বলে মনে করেন?
মোসলেহ্ উদ্দীন: বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণে জোর দিতে হবে। যথাযথ চ্যানেলে রেমিট্যান্স আনা এবং আমদানি ও রপ্তানিতে যাতে ওভার বা আন্ডার ইনভয়েসিং যেন না হয়, সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এক সময় এলসি ব্যবস্থা উঠে গিয়ে ব্লকচেইন, কন্ট্রাক্ট এবং ফ্যাক্টরিংয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালিত হবে। এসব আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে।
ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমাতে আপনার পরামর্শ কী?
মোসলেহ্ উদ্দীন: খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ সুশাসন ঘাটতি। কমিয়ে আনতে ব্যাংক দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে এবং পর্ষদকে তা ‘সুপারভাইজ’ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন নতুন সংস্কারে কাজ করছে। এসব উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করলে এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যদি হস্তক্ষেপ না করে তাহলে যে কোনো ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে পারে।


















