নিত্যপণ্যের বাজারে পাগলা ঘোড়ার দৌঁড়
নিত্যপণ্যের দামের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। চাল, আটা, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে প্রায় সব নিত্যপণ্যে লাগামহীনভাবে দাম বাড়ছে। ডিম, মাছ, মাংস, ভৈজ্যতেল, পেঁয়াজ, চিনি, আদা, রসুনসহ সব ধরনের সবজির দাম ভোক্তা সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
নিন্মবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ক্রেতারা বলছেন, নিত্যপণ্যেরে বাজারে লাগামহীন পাগলা ঘোড়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ দুই মাস না গড়াতেই নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে জনমনে ক্ষোভ ছড়াতে শুরু করেছে। তবে জনস্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সরকার শুরু থেকে নামামুখি উদ্যোগ নিলেও তার সুফল মিলছে না। নিত্যপণ্যের দাম কমাতে প্রথম দফায় পেঁয়াজ ও আলুর আমদানি শুল্ক কমিয়েছে। নতুন করে শুল্ক হ্রাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ভোজ্যতেল ও ডিমের আমদানি পর্য়ায়ে। পরিবহন ভাড়াসহ সম্পৃক্ত অন্যান্য খাতের সুবিধার্থে জ্বালানি তেলের দাম কমায়। বাজারে চাহিদা ও সরবরাহ ঘাটতি কমাতে ডিম আমদানির অনুমোতিও দিয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধায় সবজিসহ ১০ নিত্যপণ্য খোলাবাজারে বিক্রি শুরু করেছে। এ সুবিধার আওতায় এনেছে পোশাক শিল্প শ্রমিকদের। কিন্তু সরকারের কোনো উদ্যোগের সুফল পাচ্ছেন না ভোক্তারা।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, এক সপ্তাহে, অর্থাৎ ৭ থেকে ১৪ অক্টোবরের মধ্যে ১২টি নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এ তালিকায় রয়েছে সয়াবিন তেল, পাম তেল, চালের কুঁড়ার তেল বা রাইস ব্র্যান অয়েল, আলু, ছোলা, পেঁয়াজ, রসুন, জিরা, দারুচিনি, ধনে, গরুর মাংস ও ডিম। ডিমের দাম নতুন করে বেড়েছে ডজনপ্রতি ১২ টাকা। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দাম উঠেছে ডজনপ্রতি ১৮০–২০০ টাকায়। দর কমাতে বাজারে সরকারী সংস্থার অভিযান হিতে বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। ডিমের দাম কমার পরিবর্তে রবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক বাজারে ডিমই পাওয়া যাচ্ছে না। খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে বেড়েছে ৭ থেকে ১০ টাকা। চিনির দাম বেড়েছে প্রকারন্তরে কেজি প্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা। স্থানীয় বা আমদানি করা কোনো মানের পেয়াঁজ ১১০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। ১৮০ টাকা দরের দেশীয় রসুন দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪০ টাকায়। আমদানি রসুন বিকাচ্ছে সর্বনিন্ম ২২০ টাকা দরে। আদার কেজি ৩০০ টাকা ছুয়েছে খুচরা বাজারে। ডিমের জোগান ঠিক রাখতে নতুন সিদ্ধান্ত আমদানিতে ২০ শতাংশ কর ছাড় ডিমের দামও এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এ অবস্থার উত্তেরণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ডিমের সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কমাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। তার অংশ হিসেবে ডিম উৎপাদক বড় কোম্পানি ও ছোট খামারিরা সরকার নির্ধারিত দামে সরাসরি ঢাকার আড়তে ডিম পাঠাবেন। মাঝখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী থাকবে না। এর ফলে পাইকারি বিক্রেতারাও সরকার নির্ধারিত দামে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে ডিম বিক্রি করবেন। সম্প্রতি কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ডিমের যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করে দেয়। নির্ধারিত দাম অনুসারে, প্রতিটি ডিমের দাম উৎপাদন পর্যায়ে ১০ টাকা ৫৮ পয়সা, পাইকারি পর্যায়ে ১১ টাকা শূন্য ১ পয়সা ও খুচরা পর্যায়ে ১১ টাকা ৮৭ পয়সা (ডজন ১৪২ টাকা ৪৪ পয়সা) হওয়ার কথা।
এদিকে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং আয়োজিত এক সংবাদ বিফ্রিংয়ে গতকাল জানানো হয়, ডিম আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক–কর ৩৩ থেকে কমিয়ে ১৩ শতাংশ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে সরকার সাড়ে চার কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দেয়। যদিও তা আসা শুরু হয়নি। ভোজ্যতেলেও কর ছাড়ে উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েক মাস ধরে সয়াবিন তেল ও পাম তেলের দাম বাড়ছে জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অভ্যন্তরীন বাজারে পরিশোধিত তেলের দাম সমন্বয় করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
দাম সমন্বয়ের বিপরীতে বিকল্প হিসেবে অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে বৈঠক করে সমিতি নেতৃবৃন্দ ভোজ্য তেলের বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার পাশপাশি স্থানীয় উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে থাকা ৫ শতাংশ শুল্কও প্রত্যাহার চেয়েছেন। এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান শুল্ক কমানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করে শিগগির প্রজ্ঞাপন জারির ইঙ্গি দিয়েছেন। রাজধানীতে ওএমএস’এ ১০ নিত্যপণ্য রাজধানীর সচিবালয় এলাকায় খাদ্য ভবনের সামনে থেকে মঙ্গলবার কৃষি ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) কর্মসূচির উদ্বোধন করেন অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ন্যায্যমূল্যে ডিম, আলু, পেঁয়াজ ও সবজি জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে জানানো হয়। এ কর্মসূচির আওতায় একজন গ্রাহক ৩০ টাকায় এক কেজি আলু, ১৩০ টাকায় এক ডজন ডিম, ৭০ টাকায় এক কেজি পেঁয়াজ, ২০ টাকায় ১ কেজি কাঁচা পেঁপে ও পাঁচ কেজি বিভিন্ন ধরনের সবুজ শাকসবজি প্যাকেজ আকারে (একসঙ্গে) কিনতে পারবেন।
জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে রাজধানীর ২০টি জায়গায় ট্রাক সেলের (ট্রাকে করে বিক্রি) মাধ্যমে এসব কৃষিপণ্য বিক্রি করা হবে। জায়গাগুলো হচ্ছে সচিবালয় এলাকার খাদ্য ভবন, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, মিরপুর-১০, বাসাবো, বছিলা, রায়ের বাজার, রাজারবাগ, মুগদা উত্তর, মুগদা দক্ষিণ, পলাশী মোড়, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, গাবতলী, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড, বেগুনবাড়ি, উত্তর খান, দক্ষিণ খান, কামরাঙ্গীরচর, রামপুরা ও জিগাতলা। পোশাকশ্রমিকদের জন্য টিসিবির বিশেষ উদ্যোগ এদিকে পোশাকশ্রমিকদের জন্য ন্যায্যমূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রি কার্যক্রম শুরু হচ্ছে আজ বুধবার। শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগ এটি। এ কর্মসূচির আওতায় পোশাকশ্রমিকেরাও ভর্তুকি মূল্যে তেল, ডাল ও চাল কিনতে পারবেন। আজ সকাল ১০টায় গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত জাবের অ্যান্ড জুবায়ের ফেব্রিকস কারখানার সামনে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল সীমিত পরিসরে এ কর্মসূচি চালু করা হবে। এতে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের এক হাজার পরিবারের মধ্যে পণ্য বিতরণ করা হবে। এর আওতা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। দুই লিটার ভোজ্যতেল, দুই কেজি ডাল ও পাঁচ কেজি চাল প্যাকেজ আকারে পাবেন শ্রমিকেরা।
বর্তমানে দেশে ফ্যামিলি কার্ডধারী এক কোটি নিম্ন আয়ের পরিবারের কাছে প্রতি মাসে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি করছে টিসিবি। পরিবার কার্ডধারী একজন ভোক্তা সর্বোচ্চ দুই লিটার ভোজ্যতেল, দুই কেজি মসুর ডাল ও পাঁচ কেজি চাল কিনতে পারেন। সরবরাহ বাড়ানোর তাগিদ কোনো কোনো গোষ্ঠী নতুন সরকারবক বেকায়দায় ফেলতে চায়েচ্ছে বলে মনে করছেন সমাজের সচেতন নাগরিকরা। তারা বলছেন, সরকারের সুন্দর উদ্যোগগুলোকে কৌশলে মহল বিশেষ জনগণের দ্বোর গোড়ায়পৌঁছাতে দিচ্ছে না। বরং বিপাকে ফেলার তৎপরতা দৃশ্যমান হচ্ছে। তারা বলছেন, দাম কমাতে বিভিন্ন পণ্যে যে শুল্ক ছাড়া দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে, তার পাশপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা জোড়দার করা ও বাজারে নজরদারি বাড়াতে হবে।
নিত্যপণ্যের দাম ও সরকারের উদ্যোগ নিয়ে জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আগের সরকার উদ্ভট সব চিন্তা দিয়ে চলত। অনেক টাকা ছাপিয়ে ওই সরকার বাজারে ছেড়েছে, যার খারাপ ফল এখনো আছে। তবে বর্তমান সরকার বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো বুঝে-শুনেই পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
গোলাম রহমান বলেন, চাঁদাবাজি ও সমাজে অস্থিরতার কারণেও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করাটা তাই জরুরি।










