ঢাকা ১২:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
সর্বশেষ:
একক গ্রাহক ঋণসীমার শর্ত শিথিল করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও ৪ কোটি ডলার কিনলো বাংলাদেশ ব্যাংক কোম্পানি করদাতার আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় বাড়ল ২ দিন শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা দিলো পদ্মা অয়েল বাংলাদেশ হবে বিনিয়োগের অন্যতম গন্তব্য: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালীর তালিকায় ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ একনেকে ৩৬ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকার ৯ প্রকল্প অনুমোদন ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত ফরচুন সুজের চেয়ারম্যানসহ কর্মকর্তাদের ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা জরিমানা পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের খরচে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে নিষেধাজ্ঞা

ডিসিসিআই গোলটেবিল আলোচনা সভায় বক্তারা

শিল্পাঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা পরিবেশ উন্নয়ন জরুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

শিল্পখাতে উন্নয়নের জন্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সুদের হার কমানো, এবং নীতিমালা সংস্কার জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি ও অর্থনীতিবিদরা। শনিবার (৫ অক্টোবর) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পথনির্দেশক’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এই আহ্বান জানান।

ডিসিসিআই সভাপতি আশরাফ আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বক্তারা বলেন, কোভিড পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করলেও বর্তমানে শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, এবং ব্যাংক ঋণের সুদের উচ্চ হার শিল্পখাতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে। শিল্পাঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে উদ্যোক্তারা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। একইসাথে কাঁচামাল আমদানিতে দীর্ঘসূত্রিতা উৎপাদন ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া, তারল্য সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন না বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সেমিনারের নির্ধারিত আলোচনায় এফবিসিসিআই’র প্রাক্তন সভাপতি মীর নাসির হোসেন, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফেকচার্স অ্যান্ড এক্সপোটার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর প্রাক্তন সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, শাশা ডেনিমস লিমিটেড’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ডিসিসিআই’র প্রাক্তন সভাপতি শামস মাহমুদ, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ’র চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ, প্রাণ-আরএফএল গ্রæপের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহসান খান চৌধুরী, মাস্টারকার্ড বাংলাদেশ-এর সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল এবং ফুডপান্ডা বাংলাদেশ’র চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আমব্রারিন রেজা অংশগ্রহণ করেন।

এফবিসিসিআই’র প্রাক্তন সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, ১৫% বেশি ব্যাংক ঋণের সুদ দিয়ে পৃথিবীতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা খুবই দুঃসাধ্য একটি ব্যাপার, তবে আমাদের উদ্যোক্তাদের সেটা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে কাস্টমস হাউসসমূহে দূনীতির কারণে ব্যবসায়ীরা মারাতœকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, যেটি নিরসনে সরকার ফিন্যান্সিয়াল রিফর্মস কমিটি গঠন করার পাশাপাশি অটোমেশন নিশ্চিত করা জরুরী বলে তিনি অভিমত জ্ঞাপন করেন। তিনি বলেন, দেশে মধ্যম আয়ের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী গড়ে ওঠেছে, যাদেরকে করজালের আওতায় নিয়ে আসা গেলে জিডিপিতে রাজস্বের অবদান অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে এবং লাভবান হবে আমাদের অর্থনীতি। তিনি আরো বলেন, উচ্চ মূল্য প্রদান করেও আমাদের শিল্পখাতে প্রয়োজনীয় নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না, তাই আমাদের অনশোর-অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানে আরো জোরারোপ করতে হবে।

লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফেকচার্স অ্যান্ড এক্সপোটার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, আমরা উদ্যোক্তারা এ দেশে থেকেই অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরো সুদৃঢ় করতে আগ্রহী। তিনি বলেন, দক্ষ ও ভালো নিয়োগের মাধ্যমে সংকট উত্তরণ সম্ভব, যেটি বাংলাদেশে ব্যাংকের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে, এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। তবে বর্তামন প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীরা ভীষণভাবে অনিশ্চিয়তা ও নিরাপত্তাহীনতরা মধ্যে রয়েছে, যা উত্তরণে শিল্পাঞ্চলে বিশেষকরে শিল্পপুলিশ ও সেনাবাহিনীর কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে, পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রেনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। এছাড়াও প্রশাসনের অনেক জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না, এক্ষেত্রে বর্তমান অন্তর্বতী সরকরের নিকট হতে সুনিদিষ্ট বার্তা প্রদান করা আবশ্যক। তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে স্থানীয়ভাবে আমাদের চাহিদা কমে গেছে, যেটা উদ্বেগের বিষয়, সেখানে সবাইকে নজর দিতে হবে। তিনি আরো বলেন, ডাবল ডিজিটের সুদ দিয়ে ব্যবসায় মুনাফা করা অসম্ভব, তাই আমাদের দীর্ঘমেয়াদী টেকসই অর্থায়ন রোডম্যাপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উপর অধিক হারে জোরারোপ করতে হবে। শুধুমাত্র রেমিট্যান্স ও দাতাদের উপর নির্ভর করলে চলবে না, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের উপর আরো অধিক হারে গুরুত্ব দিতে হবে।

বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিদ্যমান শ্রমিক অসন্তোষে কার্যক্রমে অনুপ্রবেশকারীদের হাত রয়েছে এবং এ অবস্থা উত্তরণে শ্রমিক-মালিক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যকার সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় করতে হবে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে শ্রমিকদের বেশকিছু দাবী মেনে নেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি শ্রমিকদের যেকোন যৌক্তিক দাবী বিজেএমইএ ও বিকেএমইএ ইতিবাচক ভাবে মেটাতে বদ্ধ পরিকর। সেই সাথে বৈশি^ক ব্রান্ডসমূহ ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের নিকট হতে পণ্যের যৌক্তিক মূল প্রাপ্তির উপর তিনি জোরারোপ করেন, যার মাধ্যমে শ্রমিক স্বার্থ আরো সুসংহত করা সম্ভব হবে। এ মূহুর্তে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কনফিডেন্স বাড়ানোর উপর আরো অধিক হারে গুরুত্ব দিচ্ছি। খেলাপী ঋণ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ সিদ্ধান্তের কারণে দেশের অধিকাংশ উদ্যোক্তাদের খেলাপী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যা পুণঃবিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি অভিমত জ্ঞাপন করেন, সেই সাথে শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহ নিরবিচ্ছিন্ন করার উপর জোরারোপ করেন।

ডিসিসিআই’র প্রাক্তন সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, বিচার বিভাগ, এনবিআর এবং বাংলাদেশে ব্যাংকে কার্যক্রমে বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়েছে, যা আশাব্যঞ্জক একটি বিষয়। তবে বর্তমান সময়ে তৈরি পোষাক খাতের জুট ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শিল্প-কারখানায় নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ায় পণ্য উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যা মোটেই কাম্য নয়, যেকোন মূল্যে এ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে, তা না হলে বাংলাদেশ বৈশি^কভাবে ইমেজ সংকটে পড়তে পাড়ে। এছাড়াও তিনি কারখানায় উৎপাদন অব্যাহত রেখে রপ্তানি সচল রাখতে নিরবিচ্ছিন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণের উপর জোরারোপ করেন। শামস মাহমুদ আরো বলেন, এলডিসি উত্তরণে আমরা এখনও প্রস্তুত নই, বিষয়টি নিয়ে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ’র চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সমস্যা সমাধানে আমরা গত দুই বছরে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছি, যার প্রভাব বর্তমান সময়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীদের আস্থার পরিবেশ উন্নয়নে দ্রæত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষকরে শিল্পখাতের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না, যেটি মোটেই কাম্য নয়, সরকারকে এ বিষয়টিতে নজর দেওয়া জরুরী। এছাড়াও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, এসএমইখাতে অর্থায়ন ও উন্নয়ন কার্যকর নীতি সহায়তা প্রদান একান্ত অপরিহার্য বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। মাসরুর রিয়াজ আরো বলেন, ঋণপত্র খোলা সহ আর্থিকখাতের অন্যান্যস সমস্যা সমাধানে রিজার্ভে আরো ৬-৮ বিলিয়ন ডলারের সংযোজন ঘটাতে হবে, সরকারকে এ ব্যাপারে জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক, সেই সাথে ফরেন এক্সচেঞ্জ ও ব্যালেন্স অফ পেমেন্টের সুসংহত করা জরুরী। তিনি আরো বলেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা আরো ভয়াবহ হবে, তাই সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার উপর আমাদের আরো মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।

প্রাণ-আরএফএল গ্রæপের চেয়ারম্যান এবং সিইও আহসান খান চৌধুরী বলেন, শ্রমিক অসন্তোষ, জ¦ালানি স্বল্পতা, ব্যাংক ঋণের সুদের উচ্চ হার সহ নানাবিধ সমস্যায় আমাদের বেসরকারিখাতে মোকাবেলা করছে, যা দ্রæততম সময়ে উন্নতি করতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের শিল্পখাতের সকল ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় কর্মসংস্থানের সুযোগ হ্রাস পাবে। আহসান খান আরো বলেন, বিদ্যমান উচ্চ ঋণের সুদের হার দিয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম অব্যাহত রাখা খুবই কঠিন এবং সুদের হার হ্রাসকরণে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। এছাড়াও ঋণ খেলাপীর সংষ্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার উপর তিনি জোরারোপ করেন। তিনি আরো বলেন, পরিবেশকে সুরক্ষা করেই আমারা প্লাস্টিকখাতকে এগিয়ে নিতে চাই।

মাস্টারকার্ড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, চলতি বছরের জুলাই, আগস্ট মাসে ডিজিটাল পেমেন্ট কার্যক্রমে বেশ হ্রাস পেলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বেড়েছে, তবে গতমাসের বন্যা ও পাবর্ত্য এলাকায় অস্থিরতার ফলে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসা উল্লেখজনক হারে হ্রাস পেয়েছে, সেই সাথে পাশর্^বর্তীদেশে ভিসা জটিলতার কারণেও এখাতে নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে ই-কমার্সখাতের উন্নয়নে আস্থার পরিবেশ উন্নতির কোন বিকল্প নেই বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। এছাড়াও বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখতে বিদ্যমান প্রণোদনা সুবিধা অব্যাহত রাখার উপর তিনি জোরারোপ করেন, সেই সাথে একটি রোডম্যাপ প্রণয়নের দাবী জানান।

ফুডপান্ডা বাংলাদেশ’র চেয়ারম্যান এবং সিইও আমব্রারিন রেজা বলেন, গত ৩ মাসে ইন্টারনেট সেবা বিঘিœত হওয়ায় বিশেষকরে ডিজিটাল সেবখাতের ব্যবসায়ীরা মারাতœকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং এখাতের অধিকাংশই উদ্যেক্তাই এসএমই, যাদের ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে স্বাভাবিক করতে দ্রæততম সময়ে স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা প্রদান করা জরুরী। এছাড়াও সারাদেশে ডিজিটাল সেবাখাতের সম্প্রসারণে ইন্টারনেট প্রাপ্তির খরচ হ্রাস করা প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

ঢাকা চেম্বারে উর্ধ্বতন সহ-সভাপতি মালিক তালহা ইসমাইল বারী, পরিচলনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ সহ বেসরকারিখাতের আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

নিউজটি শেয়ার করুন
ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

ডিসিসিআই গোলটেবিল আলোচনা সভায় বক্তারা

শিল্পাঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা পরিবেশ উন্নয়ন জরুরি

আপডেট সময় ০২:২২:৫৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৬ অক্টোবর ২০২৪

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

শিল্পখাতে উন্নয়নের জন্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সুদের হার কমানো, এবং নীতিমালা সংস্কার জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি ও অর্থনীতিবিদরা। শনিবার (৫ অক্টোবর) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পথনির্দেশক’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এই আহ্বান জানান।

ডিসিসিআই সভাপতি আশরাফ আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বক্তারা বলেন, কোভিড পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করলেও বর্তমানে শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, এবং ব্যাংক ঋণের সুদের উচ্চ হার শিল্পখাতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে। শিল্পাঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে উদ্যোক্তারা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। একইসাথে কাঁচামাল আমদানিতে দীর্ঘসূত্রিতা উৎপাদন ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া, তারল্য সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন না বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সেমিনারের নির্ধারিত আলোচনায় এফবিসিসিআই’র প্রাক্তন সভাপতি মীর নাসির হোসেন, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফেকচার্স অ্যান্ড এক্সপোটার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর প্রাক্তন সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, শাশা ডেনিমস লিমিটেড’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ডিসিসিআই’র প্রাক্তন সভাপতি শামস মাহমুদ, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ’র চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ, প্রাণ-আরএফএল গ্রæপের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহসান খান চৌধুরী, মাস্টারকার্ড বাংলাদেশ-এর সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল এবং ফুডপান্ডা বাংলাদেশ’র চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আমব্রারিন রেজা অংশগ্রহণ করেন।

এফবিসিসিআই’র প্রাক্তন সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, ১৫% বেশি ব্যাংক ঋণের সুদ দিয়ে পৃথিবীতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা খুবই দুঃসাধ্য একটি ব্যাপার, তবে আমাদের উদ্যোক্তাদের সেটা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে কাস্টমস হাউসসমূহে দূনীতির কারণে ব্যবসায়ীরা মারাতœকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, যেটি নিরসনে সরকার ফিন্যান্সিয়াল রিফর্মস কমিটি গঠন করার পাশাপাশি অটোমেশন নিশ্চিত করা জরুরী বলে তিনি অভিমত জ্ঞাপন করেন। তিনি বলেন, দেশে মধ্যম আয়ের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী গড়ে ওঠেছে, যাদেরকে করজালের আওতায় নিয়ে আসা গেলে জিডিপিতে রাজস্বের অবদান অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে এবং লাভবান হবে আমাদের অর্থনীতি। তিনি আরো বলেন, উচ্চ মূল্য প্রদান করেও আমাদের শিল্পখাতে প্রয়োজনীয় নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না, তাই আমাদের অনশোর-অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানে আরো জোরারোপ করতে হবে।

লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফেকচার্স অ্যান্ড এক্সপোটার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, আমরা উদ্যোক্তারা এ দেশে থেকেই অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরো সুদৃঢ় করতে আগ্রহী। তিনি বলেন, দক্ষ ও ভালো নিয়োগের মাধ্যমে সংকট উত্তরণ সম্ভব, যেটি বাংলাদেশে ব্যাংকের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে, এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। তবে বর্তামন প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীরা ভীষণভাবে অনিশ্চিয়তা ও নিরাপত্তাহীনতরা মধ্যে রয়েছে, যা উত্তরণে শিল্পাঞ্চলে বিশেষকরে শিল্পপুলিশ ও সেনাবাহিনীর কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে, পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রেনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। এছাড়াও প্রশাসনের অনেক জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না, এক্ষেত্রে বর্তমান অন্তর্বতী সরকরের নিকট হতে সুনিদিষ্ট বার্তা প্রদান করা আবশ্যক। তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে স্থানীয়ভাবে আমাদের চাহিদা কমে গেছে, যেটা উদ্বেগের বিষয়, সেখানে সবাইকে নজর দিতে হবে। তিনি আরো বলেন, ডাবল ডিজিটের সুদ দিয়ে ব্যবসায় মুনাফা করা অসম্ভব, তাই আমাদের দীর্ঘমেয়াদী টেকসই অর্থায়ন রোডম্যাপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উপর অধিক হারে জোরারোপ করতে হবে। শুধুমাত্র রেমিট্যান্স ও দাতাদের উপর নির্ভর করলে চলবে না, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের উপর আরো অধিক হারে গুরুত্ব দিতে হবে।

বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিদ্যমান শ্রমিক অসন্তোষে কার্যক্রমে অনুপ্রবেশকারীদের হাত রয়েছে এবং এ অবস্থা উত্তরণে শ্রমিক-মালিক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যকার সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় করতে হবে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে শ্রমিকদের বেশকিছু দাবী মেনে নেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি শ্রমিকদের যেকোন যৌক্তিক দাবী বিজেএমইএ ও বিকেএমইএ ইতিবাচক ভাবে মেটাতে বদ্ধ পরিকর। সেই সাথে বৈশি^ক ব্রান্ডসমূহ ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের নিকট হতে পণ্যের যৌক্তিক মূল প্রাপ্তির উপর তিনি জোরারোপ করেন, যার মাধ্যমে শ্রমিক স্বার্থ আরো সুসংহত করা সম্ভব হবে। এ মূহুর্তে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কনফিডেন্স বাড়ানোর উপর আরো অধিক হারে গুরুত্ব দিচ্ছি। খেলাপী ঋণ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ সিদ্ধান্তের কারণে দেশের অধিকাংশ উদ্যোক্তাদের খেলাপী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যা পুণঃবিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি অভিমত জ্ঞাপন করেন, সেই সাথে শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহ নিরবিচ্ছিন্ন করার উপর জোরারোপ করেন।

ডিসিসিআই’র প্রাক্তন সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, বিচার বিভাগ, এনবিআর এবং বাংলাদেশে ব্যাংকে কার্যক্রমে বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়েছে, যা আশাব্যঞ্জক একটি বিষয়। তবে বর্তমান সময়ে তৈরি পোষাক খাতের জুট ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শিল্প-কারখানায় নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ায় পণ্য উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যা মোটেই কাম্য নয়, যেকোন মূল্যে এ পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে, তা না হলে বাংলাদেশ বৈশি^কভাবে ইমেজ সংকটে পড়তে পাড়ে। এছাড়াও তিনি কারখানায় উৎপাদন অব্যাহত রেখে রপ্তানি সচল রাখতে নিরবিচ্ছিন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণের উপর জোরারোপ করেন। শামস মাহমুদ আরো বলেন, এলডিসি উত্তরণে আমরা এখনও প্রস্তুত নই, বিষয়টি নিয়ে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ’র চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সমস্যা সমাধানে আমরা গত দুই বছরে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছি, যার প্রভাব বর্তমান সময়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীদের আস্থার পরিবেশ উন্নয়নে দ্রæত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষকরে শিল্পখাতের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না, যেটি মোটেই কাম্য নয়, সরকারকে এ বিষয়টিতে নজর দেওয়া জরুরী। এছাড়াও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, এসএমইখাতে অর্থায়ন ও উন্নয়ন কার্যকর নীতি সহায়তা প্রদান একান্ত অপরিহার্য বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। মাসরুর রিয়াজ আরো বলেন, ঋণপত্র খোলা সহ আর্থিকখাতের অন্যান্যস সমস্যা সমাধানে রিজার্ভে আরো ৬-৮ বিলিয়ন ডলারের সংযোজন ঘটাতে হবে, সরকারকে এ ব্যাপারে জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক, সেই সাথে ফরেন এক্সচেঞ্জ ও ব্যালেন্স অফ পেমেন্টের সুসংহত করা জরুরী। তিনি আরো বলেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা আরো ভয়াবহ হবে, তাই সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার উপর আমাদের আরো মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।

প্রাণ-আরএফএল গ্রæপের চেয়ারম্যান এবং সিইও আহসান খান চৌধুরী বলেন, শ্রমিক অসন্তোষ, জ¦ালানি স্বল্পতা, ব্যাংক ঋণের সুদের উচ্চ হার সহ নানাবিধ সমস্যায় আমাদের বেসরকারিখাতে মোকাবেলা করছে, যা দ্রæততম সময়ে উন্নতি করতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের শিল্পখাতের সকল ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় কর্মসংস্থানের সুযোগ হ্রাস পাবে। আহসান খান আরো বলেন, বিদ্যমান উচ্চ ঋণের সুদের হার দিয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম অব্যাহত রাখা খুবই কঠিন এবং সুদের হার হ্রাসকরণে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। এছাড়াও ঋণ খেলাপীর সংষ্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার উপর তিনি জোরারোপ করেন। তিনি আরো বলেন, পরিবেশকে সুরক্ষা করেই আমারা প্লাস্টিকখাতকে এগিয়ে নিতে চাই।

মাস্টারকার্ড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, চলতি বছরের জুলাই, আগস্ট মাসে ডিজিটাল পেমেন্ট কার্যক্রমে বেশ হ্রাস পেলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বেড়েছে, তবে গতমাসের বন্যা ও পাবর্ত্য এলাকায় অস্থিরতার ফলে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসা উল্লেখজনক হারে হ্রাস পেয়েছে, সেই সাথে পাশর্^বর্তীদেশে ভিসা জটিলতার কারণেও এখাতে নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে ই-কমার্সখাতের উন্নয়নে আস্থার পরিবেশ উন্নতির কোন বিকল্প নেই বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। এছাড়াও বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখতে বিদ্যমান প্রণোদনা সুবিধা অব্যাহত রাখার উপর তিনি জোরারোপ করেন, সেই সাথে একটি রোডম্যাপ প্রণয়নের দাবী জানান।

ফুডপান্ডা বাংলাদেশ’র চেয়ারম্যান এবং সিইও আমব্রারিন রেজা বলেন, গত ৩ মাসে ইন্টারনেট সেবা বিঘিœত হওয়ায় বিশেষকরে ডিজিটাল সেবখাতের ব্যবসায়ীরা মারাতœকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং এখাতের অধিকাংশই উদ্যেক্তাই এসএমই, যাদের ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে স্বাভাবিক করতে দ্রæততম সময়ে স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা প্রদান করা জরুরী। এছাড়াও সারাদেশে ডিজিটাল সেবাখাতের সম্প্রসারণে ইন্টারনেট প্রাপ্তির খরচ হ্রাস করা প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

ঢাকা চেম্বারে উর্ধ্বতন সহ-সভাপতি মালিক তালহা ইসমাইল বারী, পরিচলনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ সহ বেসরকারিখাতের আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

নিউজটি শেয়ার করুন